নাজমুল ও এলি — দুটি হৃদয়, এক বন্ধুত্বপর্ব ৫: যে সিদ্ধান্ত তাদের বন্ধুত্বের পরীক্ষা নিলঅধ্যায় ১: শুক্রবারের সেই খবরশুক্রবারের সকালটা অন্য সব স্কুলের দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। সূর্য উজ্জ্বলভাবে আলো ছড়াচ্ছিল, ছাত্রছাত্রীরা তাড়াহুড়ো করে স্কুলের গেট দিয়ে ঢুকছিল, আর শিক্ষকরা নিজেদের ক্লাসের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।কিন্তু নাজমুল লক্ষ্য করল, এলি আজ অস্বাভাবিক রকমের চুপচাপ।সাধারণত এলি হাসিমুখে তাকে অভিবাদন জানাত। তারপর ফুটবল, তাদের স্কুলের প্রজেক্ট কিংবা আগের দিনের কোনো মজার ঘটনা নিয়ে কথা শুরু করত। কিন্তু আজ সে নাজমুলের পাশে হাঁটছিল, অথচ তেমন কিছু বলছিল না।নাজমুল জিজ্ঞেস করল, “এলি, সব ঠিক আছে তো?”
নাজমুল ও এলি — দুটি হৃদয়, এক বন্ধুত্ব
পর্ব ৫: যে সিদ্ধান্ত তাদের বন্ধুত্বের পরীক্ষা নিল
অধ্যায় ১: শুক্রবারের সেই খবর
শুক্রবারের সকালটা অন্য সব স্কুলের দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। সূর্য উজ্জ্বলভাবে আলো ছড়াচ্ছিল, ছাত্রছাত্রীরা তাড়াহুড়ো করে স্কুলের গেট দিয়ে ঢুকছিল, আর শিক্ষকরা নিজেদের ক্লাসের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
কিন্তু নাজমুল লক্ষ্য করল, এলি আজ অস্বাভাবিক রকমের চুপচাপ।
সাধারণত এলি হাসিমুখে তাকে অভিবাদন জানাত। তারপর ফুটবল, তাদের স্কুলের প্রজেক্ট কিংবা আগের দিনের কোনো মজার ঘটনা নিয়ে কথা শুরু করত। কিন্তু আজ সে নাজমুলের পাশে হাঁটছিল, অথচ তেমন কিছু বলছিল না।
নাজমুল জিজ্ঞেস করল, “এলি, সব ঠিক আছে তো?”
এলি পুরোনো গাছটার কাছে এসে থামল।
“তোমাকে একটা কথা বলতে হবে। গত রাতে বাবা আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন।”
নাজমুল মনোযোগ দিয়ে তার দিকে তাকাল।
“অন্য শহরে চলে যাওয়ার ব্যাপারে?”
এলি মাথা নাড়ল।
“বাবা অন্য একটি শহরে চাকরির প্রস্তাব পেয়েছেন। এটা তাঁর জন্য ভালো সুযোগ, আর আমাদের পরিবারের অবস্থাও হয়তো আরও ভালো হতে পারে। এখন আমার বাবা-মা সত্যিই বিষয়টা নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন।”
নাজমুলের বুকটা যেন ভারী হয়ে গেল।
“তাহলে তুমি কি চলে যাচ্ছ?”
এলি উত্তর দিল, “এখনও জানি না। বাবা-মা চান আমি আমার মতামত জানাই। তাঁরা বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত আমার পড়াশোনা, বন্ধুত্ব এবং জীবনের ওপর প্রভাব ফেলবে, তাই আমার মতামতও গুরুত্বপূর্ণ।”
নাজমুল মাটির দিকে তাকাল। সে এলিকে থেকে যেতে বলতে চাইছিল, কিন্তু বুঝতে পারছিল যে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়।
তার মনে পড়ল, এলি আগেই বলেছিল—তার বাবার জন্য একটি ভালো সুযোগ হয়তো পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎকে আরও সুন্দর করে তুলতে পারে।
কিছুক্ষণ পর নাজমুল মাথা তুলে বলল,
“এলি, আমি চাই তুমি এখানে থাকো, কারণ তুমি আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। কিন্তু আমি এটাও চাই, তুমি নিজের এবং পরিবারের জন্য যেটা সঠিক, সেটাই বেছে নাও।”
এলি অবাক হয়ে তাকাল।
“তার মানে, আমি চলে গেলেও তুমি এটা মেনে নেবে?”
নাজমুল মাথা নাড়ল, যদিও কথাটা ভাবতেই তার কষ্ট হচ্ছিল।
“হ্যাঁ। সত্যিকারের বন্ধুত্ব মানে কাউকে জোর করে আটকে রাখা নয়। বন্ধুত্ব মানে একে অপরের ভালো চাওয়া, এমনকি সেই ভালো সিদ্ধান্তটা যদি আমাদের নিজেদের জন্য কষ্টের হয়, তবুও।”
এলি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
“এই কারণেই আমি তোমাকে বিশ্বাস করি, নাজমুল। তুমি শুধু আমার পছন্দের কথা বলো না। তুমি যেটাকে সঠিক মনে করো, সেটাই বলো।”
স্কুলের ঘণ্টা বেজে উঠল। তারা একসঙ্গে ক্লাসের দিকে হাঁটতে লাগল।
কিন্তু দুজনেই বুঝতে পারছিল, তাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা বদলে গেছে।
প্রথমবারের মতো তাদের বন্ধুত্ব এমন এক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েছিল, যার সমাধান শুধু একটি প্রতিশ্রুতি দিয়ে করা সম্ভব ছিল না।
অধ্যায় ২: গুজবের ফিরে আসা
দুপুরের বিরতিতে নাজমুল একটি বই ফেরত দিতে স্কুলের লাইব্রেরিতে গেল। ফিরে এসে সে দেখল, দুজন ছাত্র ক্লাসরুমের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে কথা বলছে।
নাজমুল কাছে যেতেই তাদের কথা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।
তার অস্বস্তি লাগল।
সে ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করল, “তোমরা কী নিয়ে কথা বলছ?”
একজন ছেলে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “কিছু না। আমরা শুধু এলির কথা বলছিলাম।”
“ওর ব্যাপারে কী?”
অন্য ছেলেটি বলল, “আমরা শুনেছি, এলি অন্য শহরে চলে যাচ্ছে। হয়তো তার পরিবার চায় না যে সে তোমার সঙ্গে আর বন্ধুত্ব রাখুক। তাই তারা চলে যাচ্ছে।”
নাজমুল অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
“তোমাদের কে বলেছে?”
ছেলেটি উত্তর দিল, “ঠিক জানি না। কেউ একজন বলেছে।”
নাজমুলের মনে পড়ে গেল পুরোনো গাছটার নিচে এলির সঙ্গে করা তাদের প্রতিশ্রুতির কথা—কোনো গুজবে বিশ্বাস করার আগে তারা একে অপরের সঙ্গে সরাসরি কথা বলবে।
সে গভীরভাবে শ্বাস নিল এবং তর্ক না করে সেখান থেকে চলে গেল।
দুপুরের খাবারের বিরতির পর সে এলিকে ক্লাসরুমে একা বসে থাকতে দেখল।
নাজমুল বলল, “এলি, তোমাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি?”
এলি উত্তর দিল, “অবশ্যই।”
নাজমুল বলল, “কয়েকজন ছাত্র বলছে, তোমার পরিবার তোমাকে অন্য শহরে নিয়ে যেতে চায়, কারণ তারা চায় না তুমি আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখো। কথাটা কি সত্যি?”
এলি হতবাক হয়ে গেল।
“না! বাবা চাকরির প্রস্তাব পেয়েছেন। আমরা সেই কারণেই অন্য শহরে যাওয়ার ব্যাপারে আলোচনা করছি। আমার পরিবারের কেউ আমাকে তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব শেষ করতে বলেনি।”
নাজমুল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
“আমি ভেবেছিলাম এমন কিছুই হবে। তবুও তোমাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম।”
এলি দুঃখের সঙ্গে মাথা নাড়ল।
“অদ্ভুত ব্যাপার, তাই না? আমরা এমনিতেই একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে চিন্তায় আছি, তার ওপর মানুষ আমাদের নিয়ে গল্প বানাচ্ছে।”
নাজমুল বলল, “হয়তো তারা আমাদের পরিস্থিতি বুঝতে পারছে না। কিন্তু অন্যদের কথাকে আমাদের বিশ্বাসের ওপর প্রভাব ফেলতে দিতে হবে না।”
এলি মৃদু হাসল।
“তুমি আমাদের প্রতিশ্রুতির কথা মনে রেখেছ।”
নাজমুল বলল, “অবশ্যই। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যখন সেটা পালন করা কঠিন হয়ে পড়ে।”
কিছুক্ষণের জন্য দুজনেই নিজেদের আরও শক্তিশালী অনুভব করল।
গুজবটি তাদের কষ্ট দিয়েছিল, কিন্তু একই সঙ্গে তাদের মনে করিয়ে দিয়েছিল—সততা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ।
অধ্যায় ৩: বাড়িতে একটি কঠিন আলোচনা
সেই সন্ধ্যায় এলি তার বাবা-মায়ের সঙ্গে খাবার টেবিলে বসেছিল।
তার বাবা কয়েকটি কাগজ টেবিলের ওপর রাখলেন।
তিনি বললেন, “আমি চাই আমরা সবাই খোলাখুলি কথা বলি। এই নতুন চাকরিটি আমাদের পরিবারের জন্য ভালো হতে পারে। কিন্তু আমি জানি, অন্য শহরে গেলে তোমাকে তোমার স্কুল এবং বন্ধুদের ছেড়ে যেতে হবে। আমি চাই না তুমি ভাবো যে তোমার মতামতের কোনো মূল্য নেই।”
এলি উত্তর দেওয়ার আগে কিছুক্ষণ ভাবল।
“বাবা, আমি জানি চাকরিটা গুরুত্বপূর্ণ। আমি বুঝতে পারছি, তুমি আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালোটা করতে চাও। কিন্তু স্কুল আর বন্ধুদের ছেড়ে যেতে হবে ভেবে আমার খুব চিন্তা হচ্ছে।”
তার মা স্নেহভরে তার হাত ধরলেন।
“এমন অনুভব করা স্বাভাবিক। পরিবর্তন মেনে নেওয়া কঠিন হতে পারে, বিশেষ করে যখন সেই পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের প্রিয় মানুষদের ছেড়ে যাওয়ার বিষয়টি জড়িয়ে থাকে।”
এলি মাথা নাড়ল।
“আমি এটাও ভাবছি যে মানুষ আমাদের চলে যাওয়ার কারণ ভুল বুঝবে। কয়েকজন ছাত্র ইতিমধ্যেই নাজমুলের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব নিয়ে গুজব ছড়াতে শুরু করেছে।”
তার বাবা চিন্তিত মুখে বললেন, “এ কথা শুনে আমার খারাপ লাগছে। কিন্তু অন্যদের গুজব আমাদের পরিবারের সিদ্ধান্ত কিংবা তুমি কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে, তা নির্ধারণ করতে পারে না।”
এলি উত্তর দিল, “আমি জানি। আজ নাজমুলও আমাকে সেই কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে।”
তার বাবা হাসলেন।
“তোমার বন্ধুটি বেশ চিন্তাশীল একজন ছেলে মনে হচ্ছে।”
এলি বলল, “ও সত্যিই তাই। আর এই সিদ্ধান্তটা আমার জন্য কঠিন হওয়ার অন্যতম কারণ হলো ও।”
তার মা কোমল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তুমি আমাদের কী কী বিষয় বিবেচনা করতে বলতে চাও?”
এলি ভেবে বলল, “আমরা যদি চলে যাই, তাহলে কি আমি আমার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে বিদায় নেওয়ার সময় পাব? আর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য আমরা কি একটা পরিকল্পনা করতে পারি?”
তার বাবা মাথা নাড়লেন।
“এগুলো যুক্তিসংগত অনুরোধ। আমরা একসঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করতে পারি।”
তারপর তিনি আরও বললেন, “কিন্তু একটা কথা মনে রেখো। তুমি তোমার বন্ধুদের খুব ভালোবাসতে পারো, আবার এটাও মেনে নিতে পারো যে জীবনে কখনও কখনও মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন পথে এগিয়ে যেতে হয়। দূরে চলে যাওয়া মানে কাউকে ভুলে যাওয়া নয়।”
এলি তার বাবা-মায়ের দিকে তাকাল। তার মনটা কিছুটা শান্ত হলো।
প্রথমবারের মতো সে বুঝতে পারল, সিদ্ধান্তটা শুধু তার পরিবার আর তার সবচেয়ে ভালো বন্ধুর মধ্যে একজনকে বেছে নেওয়ার বিষয় নয়।
বরং বিষয়টা হলো, পরিবারের প্রয়োজন এবং তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক—দুটোকেই কীভাবে সম্মান করা যায়, সেই পথ খুঁজে বের করা।
অধ্যায় ৪: নাজমুলের পরামর্শ
পরের দিন সকালে নাজমুল বাড়িতে তার বাবাকে কিছু জিনিস গোছাতে সাহায্য করছিল। এমন সময় তার ফোন বেজে উঠল।
ফোন করেছিল এলি।
এলি জিজ্ঞেস করল, “আমরা কি পুরোনো গাছটার নিচে দেখা করতে পারি?”
নাজমুল বলল, “অবশ্যই। আমি শিগগিরই আসছি।”
নাজমুল সেখানে পৌঁছে দেখল, এলি আগে থেকেই অপেক্ষা করছে। তার হাতে দুটো চায়ের কাপ।
এলি বলল, “গত রাতে আমি বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁরা এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি, কিন্তু আমার কথা মন দিয়ে শুনেছেন। আমরা ঠিক করেছি, যদি অন্য শহরে যেতে হয়, তাহলে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার একটা পরিকল্পনা করব।”
নাজমুল হাসল।
“তারা তোমার কথা শুনেছেন জেনে আমার ভালো লাগছে।”
এলি বলল, “কিন্তু তাঁরা যখন আমাকে জিজ্ঞেস করবেন আমি কী চাই, তখন কী বলব, সেটা এখনও বুঝতে পারছি না।”
নাজমুল তার পাশে বসল।
“তাহলে সত্যি কথাটাই বলো। বলো যে তুমি এখানে থাকতে চাও, কারণ তুমি তোমার স্কুল আর বন্ধুদের ভালোবাসো। কিন্তু একই সঙ্গে তুমি এটাও বোঝো যে নতুন চাকরিটা তোমার পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।”
এলি চিন্তিত মুখে জিজ্ঞেস করল, “যদি তাঁরা আমাকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে বলেন?”
নাজমুল সাবধানে উত্তর দিল, “শুধু আমাকে হারানোর ভয়ে সিদ্ধান্ত নিও না। আবার মন খারাপ হলেও এমন ভান কোরো না যে তুমি খুশি। নিজের অনুভূতিগুলো সততার সঙ্গে বোঝাও, আর তোমার বাবা-মা কী বলতে চান, সেটাও মন দিয়ে শোনো।”
এলি বাতাসে নড়তে থাকা পাতাগুলোর দিকে তাকাল।
সে বলল, “জানো, আগে আমি ভাবতাম ভালো বন্ধু হওয়ার অর্থ হলো সব সময় কারও সঙ্গে একমত হওয়া।”
নাজমুল মৃদু হেসে বলল, “আমিও আগে তাই ভাবতাম। কিন্তু বন্ধুত্ব মানে সব বিষয়ে একমত হওয়া নয়। কখনও কখনও একজন ভালো বন্ধু তোমাকে পরিষ্কারভাবে ভাবতে সাহায্য করে, এমনকি সত্যিটা মেনে নেওয়া কঠিন হলেও।”
এলি হাসল।
“তোমার মতো বন্ধু পেয়ে আমি ভাগ্যবান।”
নাজমুল উত্তর দিল, “আমিও তোমার মতো বন্ধু পেয়ে ভাগ্যবান।”
কিছুক্ষণ তারা চুপচাপ বসে দূরে ছোট ছাত্রদের ফুটবল খেলতে দেখল।
তারপর এলি বলল, “যাই ঘটুক না কেন, আমি চাই না আমাদের বন্ধুত্বের কারণে আমাদের কেউ অপরাধবোধে ভুগুক।”
নাজমুল উত্তর দিল, “আমিও তা চাই না। আমাদের বন্ধুত্ব আমাদের শক্তি জোগাবে, আমাদের আটকে রাখবে না।”
গাছটার নিচ থেকে চলে যাওয়ার পরও কথাগুলো এলির মনে রয়ে গেল।
অধ্যায় ৫: সিদ্ধান্ত
রবিবার সন্ধ্যায় এলির পরিবার বসার ঘরে একত্রিত হলো।
তার বাবা ব্যাখ্যা করলেন যে কোম্পানির কাছ থেকে শিগগিরই উত্তর দিতে হবে। নতুন চাকরিটি পেশাগতভাবে আরও ভালো সুযোগ এনে দিতে পারে, কিন্তু তিনি চাকরিটি গ্রহণ করলে পরিবারকে অন্য শহরে চলে যেতে হবে।
তার বাবা বললেন, “আমরা একে অপরের কথা শুনেছি। এবার আমি জানতে চাই, তোমার কী মনে হচ্ছে, এলি। আমাদের খুশি করার জন্য তোমাকে নিজের অনুভূতি লুকাতে হবে না।”
এলি গভীরভাবে শ্বাস নিল।
সে বলল, “আমি এখানে থাকতে চাই। আমি আমার স্কুলকে ভালোবাসি, আর বন্ধুদের ছেড়ে যেতে চাই না। বিশেষ করে নাজমুলকে। ও আমার কাছে ভাইয়ের মতো হয়ে উঠেছে।”
তার মা স্নেহভরে হাসলেন।
এলি আবার বলল, “কিন্তু আমি এটাও বুঝি যে এই চাকরিটি আমাদের পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। শুধু পরিবর্তনের ভয়ে আমি চাই না তোমরা একটা ভালো সুযোগ ছেড়ে দাও।”
তার বাবা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে তোমার মতে আমাদের কী করা উচিত?”
এলি কিছুক্ষণ থামল।
“আমার মনে হয়, আমাদের সব দিক বিবেচনা করা উচিত। যদি এমন কোনো উপায় থাকে যাতে আমরা এখানে থেকেও পরিবারের পরিস্থিতির উন্নতি করতে পারি, তাহলে আমি চাই আমরা সেটা খুঁজে দেখি। কিন্তু যদি অন্য শহরে যাওয়াই সত্যিই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে আমি সেটা মেনে নেওয়ার চেষ্টা করব। আমার শুধু অনুরোধ, আমরা যেন সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিই।”
তার বাবা-মা একে অপরের দিকে চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকালেন।
অবশেষে তার বাবা বললেন, “পরিস্থিতিটা দেখার এটাই পরিণত উপায়। আমরা কোম্পানির সঙ্গে কথা বলে অন্য কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা জানার চেষ্টা করব। তবে আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে শেষ পর্যন্ত অন্য শহরে যাওয়া প্রয়োজন হতে পারে।”
এলি মাথা নাড়ল।
সে নিজের প্রত্যাশামতো উত্তর পায়নি, কিন্তু সততার সঙ্গে কথা বলতে পেরে তার ভালো লাগছিল।
সে বাবা-মাকে তাদের পরিকল্পনা বাতিল করতে অনুরোধ করে কাঁদেনি। নিজের কষ্টও লুকায়নি। সে মন দিয়ে শুনেছে, নিজের অনুভূতি বুঝিয়েছে এবং পরিবারকে বুঝতে সাহায্য করেছে যে তার কাছে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।
সেই রাতে এলি নাজমুলকে একটি বার্তা পাঠাল।
“আমি বাবা-মায়ের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলেছি। এখনও জানি না কী হবে, কিন্তু সত্যি কথা বলতে পেরে আমার মনটা হালকা লাগছে। তাঁরা যা-ই সিদ্ধান্ত নিন না কেন, আমি চাই আমরা সাহসের সঙ্গে পরিস্থিতির মুখোমুখি হই।”
নাজমুল বার্তাটি পড়ে উত্তর দিল,
“তোমাকে নিয়ে আমি গর্বিত, বন্ধু। সাহসী হওয়ার অর্থ এই নয় যে তুমি কখনও ভয় পাবে না। সাহসী হওয়ার অর্থ হলো সত্যি কথা বলা এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হলেও এগিয়ে চলা।”
এলি ফোনের দিকে তাকিয়ে হাসল।
হয়তো সিদ্ধান্তটা এখনও কষ্টের হবে। হয়তো তাকে স্কুল, পুরোনো গাছ এবং পরিচিত রাস্তাগুলো ছেড়ে চলে যেতে হবে।
কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল—বন্ধুত্ব মানে ভবিষ্যৎকে নিজের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করা নয়। বরং ভবিষ্যতের মুখোমুখি হওয়ার সময় একে অপরের প্রতি সদয় থাকা এবং সম্মান বজায় রাখা।
অধ্যায় ৬: দূরত্বের ওপারেও একটি প্রতিশ্রুতি
সোমবার সকালে ক্লাস শুরু হওয়ার আগে নাজমুল ও এলি পুরোনো গাছটার নিচে দেখা করল।
গাছের ডালগুলো বাতাসে মৃদুভাবে দুলছিল। পরিচিত জায়গাটিতে এসে দুজনেরই মন শান্ত হয়ে গেল।
এলি নাজমুলের হাতে একটি ছোট নোটবুক দিল।
নাজমুল জিজ্ঞেস করল, “এটা কী?”
এলি উত্তর দিল, “একটা বন্ধুত্বের ডায়েরি। আমি যদি অন্য শহরে চলে যাই, তাহলে আমরা দুজন এতে লিখতে পারব। নিজেদের চিন্তা, দুশ্চিন্তা, সাফল্য আর প্রতিদিনের ছোট ছোট ঘটনা এখানে ভাগ করে নিতে পারব।”
নাজমুল নোটবুকটা খুলল। প্রথম পাতায় এলি লিখেছিল:
“ভিন্ন পটভূমি। ভিন্ন পথচলা। কিন্তু সম্মানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এক বন্ধুত্ব।”
নাজমুল হাসল।
“দারুণ একটা পরিকল্পনা! তবে আমাদের দুজনকেই লিখতে হবে। সব কাজ শুধু আমাকে দিয়ে করানো যাবে না!”
এলি হেসে বলল, “ঠিক আছে!”
তারা হাত মেলাল। তারপর পাশাপাশি বসে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর নাজমুল গম্ভীর হয়ে বলল,
“এলি, আমি চাই তুমি একটা কথা মনে রেখো। তুমি চলে গেলে আমার কষ্ট হবে। হয়তো প্রতিদিন তোমাকে মনে পড়বে। কিন্তু পরিবারের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে আমি কখনও তোমাকে দোষ দেব না।”
এলির চোখ আবেগে ভরে উঠল।
“আর আমি চাই তুমি মনে রেখো, দূরত্ব আমাকে তোমাকে ভুলিয়ে দিতে পারবে না। আমি তোমাকে ফোন করব, চিঠি লিখব এবং আমার নতুন জীবনের গল্প শোনাব। তোমার জীবনে কী ঘটছে, সেটাও জানতে চাই।”
নাজমুল মাথা নাড়ল।
“তাহলে আমাদের একটা পরিকল্পনা আছে।”
এলি জিজ্ঞেস করল, “যাই ঘটুক না কেন?”
নাজমুল উত্তর দিল, “যাই ঘটুক না কেন।”
স্কুলের ঘণ্টা বেজে উঠল।
তারা উঠে দাঁড়াল এবং একসঙ্গে ক্লাসরুমের দিকে হাঁটতে লাগল।
পরের মাসেও তারা পাশাপাশি বসবে কি না, তা কেউ জানত না। কোম্পানি কী সিদ্ধান্ত নেবে কিংবা শেষ পর্যন্ত এলির পরিবার কোথায় থাকবে, সেটাও তাদের অজানা ছিল।
কিন্তু তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছিল।
সত্যিকারের বন্ধুত্ব জীবনের সবকিছু অপরিবর্তিত রাখার দাবি করে না। বরং এটি মানুষকে পরিবর্তনের মুখোমুখি হওয়ার সাহস দেয়, যাতে তারা একে অপরকে একত্রিত করা সম্মান, সততা ও যত্ন কখনও হারিয়ে না ফেলে।
ক্লাসরুমে ঢোকার সময় এলি নাজমুলের দিকে ফিরে হাসল।
“ভবিষ্যতে যা-ই ঘটুক না কেন, তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে বলে আমি খুশি।”
নাজমুলও হাসল।
“আমিও, এলি। আমিও।”
আর পুরোনো গাছটার নিচে তাদের প্রতিশ্রুতি আরও দৃঢ় হতে থাকল—গুজবের চেয়ে শক্তিশালী, ভয়ের চেয়ে শক্তিশালী এবং ভবিষ্যতের যেকোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত।
চলবে পর্ব ৬-এ — অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত।
Written with AI
Comments
Post a Comment