পার্ট ২: ক্ষমতা চলে গেলে কী অবশিষ্ট থাকে?ক্ষমতা বনাম আত্ম-মূল্য: মারাত্মক বিভ্রান্তিআধুনিক জীবনের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ভুলগুলোর একটি হলো ক্ষমতাকে আত্ম-মূল্যের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা।ক্ষমতা বাহ্যিক।আত্ম-মূল্য অন্তর্গত।কিন্তু সমাজ ইচ্ছাকৃতভাবেই এই সীমারেখা মুছে দেয়। ছোটবেলা থেকেই মানুষকে পুরস্কৃত করা হয় সে কী নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তার জন্য—
পার্ট ২: ক্ষমতা চলে গেলে কী অবশিষ্ট থাকে?
ক্ষমতা বনাম আত্ম-মূল্য: মারাত্মক বিভ্রান্তি
আধুনিক জীবনের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ভুলগুলোর একটি হলো ক্ষমতাকে আত্ম-মূল্যের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা।
ক্ষমতা বাহ্যিক।
আত্ম-মূল্য অন্তর্গত।
কিন্তু সমাজ ইচ্ছাকৃতভাবেই এই সীমারেখা মুছে দেয়। ছোটবেলা থেকেই মানুষকে পুরস্কৃত করা হয় সে কী নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তার জন্য—নম্বর, টাকা, পদ, প্রভাব। ধীরে ধীরে আত্ম-মূল্য নিজের ভেতরের অনুভূতি না থেকে বাইরের মাপকাঠিতে পরিণত হয়।
ক্ষমতা বাড়লে আত্ম-মূল্য ফুলে ওঠে।
ক্ষমতা কমলে আত্ম-মূল্য ভেঙে পড়ে।
এই কারণেই ক্ষমতা হারানো এতটা অস্তিত্বগত আঘাত দেয়। প্রভাব হারানো নয়—নিজেকে মূল্যবান মনে করার অনুমতি হারানোই আসল ক্ষতি।
সমাজ কেন ক্ষমতাহীনদের প্রতি নিষ্ঠুর
সমাজ ক্ষমতাহীন মানুষকে শুধু উপেক্ষা করে না—অনেক সময় শাস্তি দেয়।
কারণ ক্ষমতাহীনতা অন্যদের দুর্বলতার কথা মনে করিয়ে দেয়। আর যারা নিয়ন্ত্রণকে নিজের পরিচয় বানিয়েছে, তাদের কাছে দুর্বলতা ভয়ের বস্তু। তাই দুর্বলতাকে উপহাস করা হয়, দোষারোপ করা হয়, নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
তুমি ব্যর্থ হলে: “তুমি চেষ্টা করোনি”
তুমি পড়ে গেলে: “এটাই তোমার শিক্ষা”
তুমি ক্ষমতা হারালে: “নিশ্চয়ই তোমার দোষ আছে”
এই নিষ্ঠুরতার একটি কাজ আছে—
এটি ক্ষমতাকে যোগ্যতার একমাত্র প্রমাণ হিসেবে ধরে রাখে।
ক্ষমতা হারানোর পর মানসিক ভাঙন
ক্ষমতা চলে গেলে মানুষ সাধারণত দুঃখ বা রাগ আশা করে। কিন্তু বাস্তবে আসে শূন্যতা।
এই শূন্যতা ভয়ঙ্কর, কারণ এর কোনো গল্প নেই। ব্যথার গল্প থাকে। রাগের লক্ষ্য থাকে। কিন্তু শূন্যতা কেবল থাকে।
মানুষ বলে—
নিজেকে অদৃশ্য লাগে
ভেতরে ফাঁকা লাগে
নিজের অস্তিত্ব অবাস্তব মনে হয়
এই সময়েই পরিচয় ভেঙে পড়ে। ভূমিকা হারায়, নাম হারায়, স্বীকৃতি হারায়। মন কারণ খোঁজে, না পেলে নিজের দিকেই আঙুল তোলে।
“আমি যদি এখন কিছুই না হই, তবে আমি আগে থেকেই কিছুই ছিলাম না।”
এখান থেকেই আত্ম-দোষারোপ শুরু হয়।
নৈরাশ্যবাদ: পছন্দ নয়, প্রতিক্রিয়া
নৈরাশ্যবাদকে প্রায়ই একটি দর্শন হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষের জন্য এটি মানসিক প্রতিক্রিয়া।
যখন অর্থ শক্তির সঙ্গে বাঁধা ছিল, আর শক্তি চলে যায়, তখন অর্থ ভেঙে পড়ে। নৈরাশ্যবাদ আসে বিদ্রোহ হিসেবে নয়, শোক হিসেবে।
মানুষ বলে না—“কিছুই অর্থপূর্ণ নয়” গর্ব থেকে।
সে বলে ক্লান্তি থেকে।
কেন “শূন্য হওয়া” মানে নিজেকে শয়তান মনে হয়
মানুষ নৈতিক গল্প বানাতে ভালোবাসে। সবকিছুর কারণ চাই। যখন শক্তি চলে যায় আর অর্থ হারায়, তখন কাউকে দোষী বানাতে হয়।
বাইরে কেউ না থাকলে, নিজের দিকেই অভিযোগ যায়।
এই কারণেই কবিতার লাইনটি এত নিখুঁত—
“আমি শয়তান হলাম, কারণ আমি শূন্য হলাম।”
এখানে শয়তান মানে নিষ্ঠুরতা নয়।
এটি নিজেকে ঘৃণা করার একটি নাম।
শূন্যতা অসহনীয় বলে তাকে নৈতিক অপরাধ বানানো হয়।
শূন্যতার সত্য
শূন্যতা পাপ নয়।
শূন্যতা হলো মুখোশ পড়ে যাওয়া।
ক্ষমতা চলে গেলে যা থাকে, তা কম মানুষ নয়—তা বেশি সৎ। অভিনয় শেষ হয়। ধার করা পরিচয় ভেঙে যায়।
এটা ভয়ঙ্কর লাগে, কারণ এখানে কোনো হাততালি নেই, কোনো শ্রেণিবিন্যাস নেই, কোনো স্বীকৃতি নেই। কিন্তু এখানেই আছে এক বিরল স্বাধীনতা।
ক্ষমতা ছাড়া পরিচয় গড়ে তোলা
ক্ষমতা হারানোর পর নতুন করে গড়া মানে আবার ক্ষমতা খোঁজা নয়। মানে হলো মূল্য নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা।
এই পথ ধীর এবং অস্বস্তিকর, কারণ এতে পুরোনো বিশ্বাস ভাঙতে হয়—
শোনা যাওয়া মানেই মূল্যবান হওয়া
প্রভাব মানেই গুরুত্ব
স্বীকৃতি মানেই অস্তিত্ব
নতুন পরিচয় দাঁড়ায়—
সততা
সচেতনতা
দায়িত্ব
ভেতরের সামঞ্জস্য
এই গুণগুলো শক্তির সঙ্গে আসে না, শক্তির সঙ্গে যায়ও না।
শক্তির ভিন্ন সংজ্ঞা
আসল শক্তি অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়।
আসল শক্তি হলো নিয়ন্ত্রণ চলে গেলেও ভেঙে না পড়া।
যে মানুষ ক্ষমতার পতনের পর নিজেকে শত্রু বানায় না, সে এমন কিছু খুঁজে পেয়েছে যা রাজত্বের চেয়েও গভীর।
শেষ ভাবনা
ক্ষমতা মানুষকে বড় করতে পারে,
কিন্তু মানুষকে সংজ্ঞায়িত করতে পারে না।
“শূন্য” হওয়া মানে “শয়তান” হওয়া নয়।
এর মানে হলো অরক্ষিত হওয়া।
আর সেই অরক্ষিত অবস্থাতেই
নতুন, নির্ভরশীলতাহীন এক সত্তার জন্ম সম্ভব।
(পার্ট ২ সমাপ্ত)
Written with AI
Comments
Post a Comment