এই অংশে আমরা দেখব চারটি সুন্নি মাজহাব (হানাফি, মালেকি, শাফেয়ি, হাম্বলি) এই বিষয়ে কী বলেছেন, কোথায় তাঁদের ঐকমত্য, আর কোথায় তাঁরা নৈতিকভাবে সতর্ক করেছেন।দাদার আগে বাবা মারা গেলেনাতি কি সত্যিই ইসলামে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়?(বাংলা – অংশ ৩: চার মাজহাবের মতামত)কেন মাজহাবের মতামত জানা জরুরি?ইসলামী উত্তরাধিকার আইন কোনো এক ব্যক্তির মতামত নয়।
এই অংশে আমরা দেখব চারটি সুন্নি মাজহাব (হানাফি, মালেকি, শাফেয়ি, হাম্বলি) এই বিষয়ে কী বলেছেন, কোথায় তাঁদের ঐকমত্য, আর কোথায় তাঁরা নৈতিকভাবে সতর্ক করেছেন।
দাদার আগে বাবা মারা গেলে
নাতি কি সত্যিই ইসলামে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়?
(বাংলা – অংশ ৩: চার মাজহাবের মতামত)
কেন মাজহাবের মতামত জানা জরুরি?
ইসলামী উত্তরাধিকার আইন কোনো এক ব্যক্তির মতামত নয়।
এটি গড়ে উঠেছে—
সাহাবিদের আমল
তাবেয়িনদের ব্যাখ্যা
শত শত বছরের ফিকহি বিশ্লেষণের মাধ্যমে
চারটি সুন্নি মাজহাব এই বিষয়ে কী বলেছেন—তা জানলে বোঝা যায়:
এই নিয়ম কোনো এক মাজহাবের কঠোরতা নয়, বরং একটি সর্বজনস্বীকৃত আইনি কাঠামো।
একটি মৌলিক বিষয়ে চার মাজহাবের ঐকমত্য
চার মাজহাবই একটি বিষয়ে একমত—
উত্তরাধিকার কেবল মৃত্যুর মুহূর্তে কার্যকর হয়
এবং কেবল জীবিত ব্যক্তিরাই উত্তরাধিকারী হতে পারেন।
এর মানে:
ভবিষ্যতের সম্ভাব্য উত্তরাধিকার ইসলামে গণ্য নয়
মৃত ব্যক্তির কোনো আইনি অবস্থান থাকে না
এই নীতির ওপর ভিত্তি করেই নাতির উত্তরাধিকার প্রশ্নটি নির্ধারিত হয়।
১. হানাফি মাজহাবের মতামত
আইনি অবস্থান
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী—
বাবা যদি দাদার আগে মারা যান
দাদার অন্য পুত্র জীবিত থাকেন
তাহলে নাতি আইনগতভাবে উত্তরাধিকারী হন না
কারণ:
জীবিত ছেলে (চাচা) নাতিকে হাজব (বাধা) দেয়
বাবার কোনো উত্তরাধিকার কার্যকর হয়নি, তাই তা সন্তানের কাছে যেতে পারে না
নৈতিক মন্তব্য
হানাফি আলেমরা স্পষ্টভাবে বলেছেন—
“আইনে বাধ্যবাধকতা না থাকলেও,
এতিম নাতিকে উপেক্ষা করা নৈতিকভাবে নিন্দনীয়।”
তাঁরা জোর দিয়েছেন:
ওসিয়ত (Wasiyyah)
জীবিত অবস্থায় দান (হিবা)
২. মালেকি মাজহাবের মতামত
আইনি অবস্থান
মালেকি মাজহাবেও একই সিদ্ধান্ত—
নাতি স্বয়ংক্রিয় উত্তরাধিকারী নন
জীবিত পুত্ররা (চাচারা) প্রধান উত্তরাধিকারী
বিশেষ জোর
মালেকি ফিকহে একটি শক্ত কথা পাওয়া যায়—
“আইনগত বৈধতা সব সময় আল্লাহর সন্তুষ্টির নিশ্চয়তা দেয় না।”
এই মাজহাবে:
এতিমের প্রতি অবহেলাকে গুরুতর সামাজিক ব্যর্থতা বলা হয়েছে
পরিবারের নৈতিক দায়িত্বকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে
৩. শাফেয়ি মাজহাবের মতামত
আইনি অবস্থান
শাফেয়ি মাজহাবের মতে—
কুরআনে যাদের উত্তরাধিকারী হিসেবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে,
কেবল তারাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিরাস পাবে
নাতি এই তালিকায় নেই, যদি জীবিত ছেলে থাকে
আইনি সতর্কতা
ইমাম শাফেয়ির দৃষ্টিভঙ্গি ছিল—
“আইনে আবেগ ঢুকলে কাঠামো ভেঙে পড়ে।”
তাই তিনি:
প্রতিনিধিত্বমূলক উত্তরাধিকার (representation) গ্রহণ করেননি
কিন্তু নৈতিক দায়িত্ব অস্বীকারও করেননি
৪. হাম্বলি মাজহাবের মতামত
আইনি অবস্থান
হাম্বলি মাজহাবও অন্য তিনটির সঙ্গে একমত—
নাতি উত্তরাধিকারী নন
জীবিত পুত্ররা নাতিকে বাধা দেয়
গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য
হাম্বলি আলেমরা বলেছেন—
“কাজির (বিচারকের) কাজ আইন প্রয়োগ করা,
আর আল্লাহ বিচার করবেন মানুষের নিয়ত ও দায়িত্ববোধ।”
অর্থাৎ:
আদালত কাউকে বাধ্য নাও করতে পারে
কিন্তু নৈতিক ব্যর্থতা আল্লাহর কাছে প্রশ্নের মুখে পড়বে
কোনো ভিন্নমত কি ছিল?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না।
কোনো প্রসিদ্ধ সাহাবি
কোনো প্রাথমিক ফিকহবিদ
কোনো সুন্নি মাজহাব
👉 কেউই বলেননি যে নাতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দাদার সম্পত্তির অংশ পাবে, যদি বাবা আগে মারা যান।
এই ঐকমত্যকে ফিকহে বলা হয় ইজমা (ঐকমত্য)।
তাহলে আধুনিক সময়ে পরিবর্তন এল কীভাবে?
এখানেই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় আসে—
আধুনিক মুসলিম রাষ্ট্রগুলো বুঝেছে:
সমাজ বদলেছে
যৌথ পরিবারের কাঠামো দুর্বল হয়েছে
এতিমরা আগের মতো নিরাপদ নয়
তাই তারা চালু করেছে—
ওসিয়তে ওয়াজিবাহ (Obligatory Bequest)
এটি:
ক্লাসিক্যাল ফিকহ বাতিল করে না
বরং নৈতিক লক্ষ্য পূরণে আইনি সহায়তা দেয়
অংশ ৩-এর সারসংক্ষেপ
চার মাজহাবই আইনি বিষয়ে একমত
নাতি স্বয়ংক্রিয় উত্তরাধিকারী নন
কিন্তু এতিমের অবহেলা সমর্থিত নয়
আইন ও নৈতিকতা আলাদা হলেও দুটোই গুরুত্বপূর্ণ
সমস্যা নিয়মে নয়, মানুষের উদাসীনতায়
👉 পরবর্তী অংশ (বাংলা – Part 4):
ইসলামী আইন বনাম ভারতীয় উত্তরাধিকার আইন
দুটি ব্যবস্থার দর্শন ও পার্থক্য
Written with AI
Comments
Post a Comment