ভূমিকা: সব সত্য কি নথিতে ধরা পড়ে?ইতিহাস বলতে আমরা সাধারণত কী বুঝি? সরকারি নথি, সংরক্ষিত দলিল, প্রকাশিত বই, আর্কাইভে রাখা কাগজপত্র। কিন্তু মানবসভ্যতার ইতিহাস কি শুধু এতটুকুই? যদি তাই হতো, তাহলে পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ—যাঁরা সমাজ বদলেছেন, চিন্তা জাগিয়েছেন, নীরবে সংগ্রাম করেছেন—তাঁরা সবাই ইতিহাসের বাইরে থেকে যেতেন।বাস্তবে ইতিহাসের একটি বড় অংশ লেখা হয়নি; বলা হয়েছে। স্মৃতির মাধ্যমে, পারিবারিক গল্পের মাধ্যমে, শিক্ষকের মুখে শোনা কথার মাধ্যমে। এই
ভূমিকা: সব সত্য কি নথিতে ধরা পড়ে?
ইতিহাস বলতে আমরা সাধারণত কী বুঝি? সরকারি নথি, সংরক্ষিত দলিল, প্রকাশিত বই, আর্কাইভে রাখা কাগজপত্র। কিন্তু মানবসভ্যতার ইতিহাস কি শুধু এতটুকুই? যদি তাই হতো, তাহলে পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ—যাঁরা সমাজ বদলেছেন, চিন্তা জাগিয়েছেন, নীরবে সংগ্রাম করেছেন—তাঁরা সবাই ইতিহাসের বাইরে থেকে যেতেন।
বাস্তবে ইতিহাসের একটি বড় অংশ লেখা হয়নি; বলা হয়েছে। স্মৃতির মাধ্যমে, পারিবারিক গল্পের মাধ্যমে, শিক্ষকের মুখে শোনা কথার মাধ্যমে। এই মৌখিক ইতিহাস অনেক সময় কাগজে লেখা ইতিহাসের চেয়েও বেশি মানবিক, বেশি জীবন্ত।
এই লেখাটি সেই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয়—
নথি না থাকলে কি কোনো ঘটনা বা কোনো মানুষ অসত্য হয়ে যায়?
আমিরউদ্দিন মুন্সী বা মাওলানা: নথিতে নেই, স্মৃতিতে আছেন
আমিরউদ্দিন মুন্সী, যাঁকে অনেকেই মাওলানা নামেও চিনতেন, তিনি আমার মায়ের দাদু। আজ তাঁর সম্পর্কে আপনি কোনো সরকারি নথি খুঁজে পাবেন না। কোনো প্রকাশিত কবিতার বই নেই, কোনো গল্পগ্রন্থ নেই, কোনো আর্কাইভে সংরক্ষিত পাণ্ডুলিপি নেই। ইতিহাসের চোখে তিনি যেন অনুপস্থিত।
কিন্তু আমার জীবনে তিনি অনুপস্থিত নন।
আমার মা এবং আমাদের বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক—দুজনেই আলাদা আলাদা সময়ে তাঁর কথা বলেছেন। তাঁরা বলেছেন, তিনি কবিতা লিখতেন, গল্প লিখতেন, মানুষকে সচেতন করতেন। বলা হয়, তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তবে কোনো প্রচারের আলোয় আসেননি। তিনি ছিলেন সেই ধরনের মানুষ, যাঁরা কাজ করেন, কিন্তু নাম লেখাতে চান না।
আজ যখন তাঁর লেখা পাওয়া যায় না, তখন অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন—
“তাহলে কী প্রমাণ যে তিনি সত্যিই লেখক ছিলেন?”
এই প্রশ্ন যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু এর উত্তর একমাত্র যুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
উপনিবেশিক ভারত ও হারিয়ে যাওয়া লেখা
আমাদের মনে রাখতে হবে, আমিরউদ্দিন মুন্সীর সময়টা ছিল উপনিবেশিক ভারতের সময়। তখন লেখালেখি মানেই বই ছাপানো নয়। অধিকাংশ কবিতা ও গল্প লেখা হতো হাতে-কলমে। কাগজ ছিল দুষ্প্রাপ্য, ছাপাখানা ছিল শহরকেন্দ্রিক, আর গ্রামীণ লেখকদের জন্য প্রকাশের সুযোগ ছিল প্রায় নেই।
এর ওপর ছিল আরও ভয়ংকর বাস্তবতা—
ব্রিটিশ শাসনের ভয়ে অনেক লেখা নষ্ট করা হয়েছে
দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার কারণে সংরক্ষণ সম্ভব হয়নি
প্রজন্মান্তরে অবহেলায় বহু পাণ্ডুলিপি হারিয়ে গেছে
দেশভাগ, দাঙ্গা, স্থানান্তরের সময় অসংখ্য স্মৃতি ও লেখা নষ্ট হয়েছে
এই বাস্তবতায় আজ কোনো লেখা না পাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। বরং অবাক হওয়ার কথা হতো যদি সব লেখা ঠিকঠাক পাওয়া যেত।
মৌখিক ইতিহাস: অবহেলিত কিন্তু শক্তিশালী
মৌখিক ইতিহাসকে আমরা প্রায়ই হালকা করে দেখি। কিন্তু পৃথিবীর বহু সভ্যতা মৌখিক ঐতিহ্যের ওপরই দাঁড়িয়ে ছিল। বেদ, উপনিষদ, লোককথা, পালাগান—সবই তো প্রথমে মুখে মুখেই ছিল।
একজন মা তাঁর সন্তানের কাছে যে গল্প বলেন, একজন শিক্ষক তাঁর ছাত্রকে যে স্মৃতি শোনান—এসব কি মূল্যহীন? নাকি এগুলোই মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে মানবিক রূপ?
আমার কাছে আমিরউদ্দিন মুন্সীর গল্প একটি পারিবারিক কল্পকাহিনি নয়। এটি একটি মৌখিক ইতিহাস, যা বিশ্বাসযোগ্য মানুষের কাছ থেকে এসেছে, প্রজন্ম পেরিয়ে এসেছে।
সত্য কি সবার জন্য একরকম?
এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
একটি ঘটনা কি সবার কাছে সমানভাবে সত্য হতে বাধ্য?
হয়তো নয়।
আমার কাছে আমিরউদ্দিন মুন্সীর অস্তিত্ব সত্য, কারণ তিনি আমার পরিচয়ের অংশ। অন্যের কাছে তিনি সন্দেহ হতে পারেন, কারণ তাঁদের কাছে কোনো দলিল নেই। এই দুই অবস্থান একসঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে।
ইতিহাসের সত্য আর ব্যক্তিগত সত্য সবসময় এক হয় না। কিন্তু তাই বলে ব্যক্তিগত সত্য মিথ্যা হয়ে যায় না।
কারবালা ও ত্রিশ হাজার ব্রাহ্মণের বিশ্বাস
এই প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি গভীর বিশ্বাস—কারবালার যুদ্ধের সময় ভারতের প্রায় ত্রিশ হাজার ব্রাহ্মণ হিন্দু ইমাম হুসাইনের সঙ্গে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন। এই ঘটনার কোনো দৃঢ় ঐতিহাসিক নথি নেই। নানা কারণে—দূরত্ব, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা—এই অংশগ্রহণ বাস্তবে ঘটেনি বা লিপিবদ্ধ হয়নি।
তাহলে প্রশ্ন আসে—
এই বিশ্বাস কি সম্পূর্ণ মিথ্যা?
হয়তো ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে এটি প্রমাণিত নয়। কিন্তু নৈতিক ও দার্শনিক দৃষ্টিতে এর গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ এই বিশ্বাস আমাদের বলে, ইমাম হুসাইন কোনো একটি ধর্মের সীমায় আবদ্ধ নন। তিনি ন্যায়ের প্রতীক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রতীক।
এই বিশ্বাসের ভেতরের সত্য হলো—ন্যায় সর্বজনীন।
নথি না থাকলে প্রশ্ন আসবেই
এটা স্বীকার করা দরকার—নথি না থাকলে প্রশ্ন উঠবে। ইতিহাসবিদ প্রশ্ন করবেন, গবেষক সন্দেহ করবেন। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রশ্ন থেকেই সবকিছুকে মিথ্যা বলে দেওয়া কি ন্যায্য?
যে সমাজ নথিকে একমাত্র সত্যের মানদণ্ড বানায়, সে সমাজ নীরব মানুষের ইতিহাস হারিয়ে ফেলে।
আমিরউদ্দিন মুন্সীর মতো মানুষরা সেই নীরব ইতিহাসের অংশ।
👉 Part–1 এখানেই শেষ।
পরের অংশে (Part–2) আমি লিখব:
সত্য, বিশ্বাস ও নৈতিকতার পার্থক্য
ইতিহাসের রাজনীতি ও ক্ষমতার ভূমিকা
প্রান্তিক মানুষের ইতিহাস
কেন কিছু গল্প টিকে থাকে শতাব্দীর পর শতাব্দী
Written with AI
Comments
Post a Comment